শেরবার্তা২৪

৯৩ বছর বয়সী বৃদ্ধ কাশেম এর আলোহীন জীবনের গল্প

একদিকে উন্নয়নের নানা গল্প, অন্যদিকে মৌলিক সুবিধাবঞ্চিত মানুষের জীবনসংগ্রাম। শেরপুরের ঝিনাইগাতী উপজেলার সদর ইউনিয়নের সারিকালীনগর নামাপাড়ার চিত্র যেন সেই বৈপরীত্যেরই উদাহরণ। স্বাধীনতার ৫৪ বছর পেরিয়ে গেলেও ওই এলাকার ৯৩ বছর বয়সী বৃদ্ধ কাশেম আলীর ঘরে পৌঁছায়নি বিদ্যুতের আলো। সন্ধ্যা নামলেই হারিকেন ও কুপি বাতির ক্ষীণ আলোয় কাটে তার দিন-রাত। গারো পাহাড়ের পাদদেশের দুর্গম এই জনপদে শুধু বিদ্যুতের সংকটই নয়, রয়েছে যোগাযোগ ব্যবস্থা, বিশুদ্ধ পানি ও স্বাস্থ্যসম্মত স্যানিটেশনের অভাব। বর্ষা এলে পানিতে ডুবে যায় বসতভিটা ও চলাচলের পথ। তখন কাশেম আলী ও তার পরিবারসহ বাড়ির লোকজনের চলাচলের একমাত্র মাধ্যম হয়ে ওঠে কলাগাছের তৈরি ভেলা।জীবনের শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে থাকা কাশেম আলী বলেন, “দেশ স্বাধীন হওয়ার সময় থেকেই এখানে আছি। এত বছর পার হয়ে গেল, কিন্তু নিজের চোখে বিদ্যুতের আলো দেখা হলো না। এখনো হারিকেন আর কুপির আলোতেই জীবন কাটে।”তিনি বলেন, “বর্ষাকালে ঘরবাড়ি পানিতে ডুবে থাকে। বাইরে যেতে হলে কলাগাছের ভেলায় উঠতে হয়। শুকনো সময়েও রাস্তা নেই, জমির আইল ধরে চলাচল করতে হয়।”অভিমান করে এই বৃদ্ধ আরও বলেন, “অনেকেই আসে, ছবি তোলে, কষ্টের কথা শোনে। কিন্তু পরে আর কেউ খবর নেয় না।”স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, কাশেম আলীর বাড়িতে বর্তমানে তিনটি পরিবার বসবাস করছে। দীর্ঘদিন ধরে তারা নাগরিক সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত। বর্ষায় পানিবন্দি হয়ে পড়া তাদের নিত্যদিনের ঘটনা। নেই বিদ্যুৎ সংযোগ, নেই বিশুদ্ধ পানির স্থায়ী ব্যবস্থা, নেই স্বাস্থ্যসম্মত শৌচাগার। এমনকি চলাচলের জন্যও নেই কোনো স্থায়ী রাস্তা।স্থানীয়রা জানান, বর্ষার সময় শিশুদের বিদ্যালয়ে যাতায়াত ব্যাহত হয়। রাতের বেলায় কুপি বাতির আলোয় চলে রান্না, পড়াশোনা ও প্রয়োজনীয় কাজ। অনেক সময় পুরোনো কাপড় দিয়ে তৈরি সলতের মাধ্যমে জ্বালানো কুপির আলোই হয়ে ওঠে তাদের একমাত্র ভরসা।এই পরিবারের দুর্ভোগের সবচেয়ে মর্মান্তিক অধ্যায় ঘটে কাশেম আলীর এক ছেলের মৃত্যুর পর। আশপাশে কোনো কবরস্থান না থাকায় বাধ্য হয়ে তাকে নিজ ঘরের মাটির মেঝেতেই দাফন করতে হয়েছে।বৃদ্ধ কাশেম আলী বলেন, “এই কষ্টের শেষ কোথায় জানি না। আবার যদি পরিবারের কেউ মারা যায়, তাহলে হয়তো তাকেও এই ঘরের মাটিতেই কবর দিতে হবে।”বিষয়টি সম্পর্কে ঝিনাইগাতী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোঃ আল-আমিন বলেন, “ঘটনাটি অত্যন্ত দুঃখজনক। দ্রুত সরেজমিনে খোঁজ নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। বিদ্যুৎ, রাস্তা, পানি ও স্যানিটেশন সুবিধার বিষয়ে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের সঙ্গে কথা বলা হবে।”তারুণ্যের ঝিনাইগাতী স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান লুৎফর রহমান বলেন, “দেশ যখন স্মার্ট বাংলাদেশের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, তখন কোনো পরিবার যদি এখনো মৌলিক সুবিধাবঞ্চিত থাকে, সেটি দুঃখজনক। প্রশাসনের দ্রুত উদ্যোগ প্রয়োজন। আমরাও নিজেদের সামর্থ অনুযায়ী পরিবারটির পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করবো।”স্থানীয়দের দাবি, সারিকালীনগর নামাপাড়ার এই অবহেলিত মানুষের জন্য দ্রুত বিদ্যুৎ সংযোগ, যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নয়ন, বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা ও প্রয়োজনীয় সরকারি সহায়তা নিশ্চিত করা হোক।উন্নয়নের আলো যখন দেশের বিভিন্ন প্রান্তে পৌঁছে যাচ্ছে, তখন শেরপুরের এই দুর্গম জনপদে কাশেম আলীর জীবন এখনো আটকে আছে হারিকেনের ম্লান আলো আর বর্ষার কলাগাছের ভেলায়।

৯৩ বছর বয়সী বৃদ্ধ কাশেম এর আলোহীন জীবনের গল্প